মানবতার ফেরিওয়ালা স্বেচ্ছাসেবী জিসান

ফিচার ডেস্ক: ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন মানুষের জন্য কিছু করার। স্বেচ্ছাসেবক হওয়ার ইচ্ছাটা তার ছোট থেকেই ছিলো। শুধু স্বপ্ন দেখেই থেমে যাননি, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য অবিরাম কাজ করেছেন এবং এখনও কাজ করে চলেছেন। বলছি, ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুহতাসিম আবশাদ জিসানের কথা।

রংপুর জেলার,  পীরগাছা উপজেলার সনামধন্য ডাক্তার পরিবারের ড. সামসুল হক এর নাতি মোঃ মুহতাসিম আবশাদ জিসান। বর্তমানে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনে প্রথম বর্ষে অধ্যায়নরত আছেন।

ছোট থেকে বেড়ে ওঠাটা এক শহুরে জীবনে। স্কুল কলেজ দুটোয় ছিলো ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ রংপুর।

ফোর, ফাইভে থাকতে যখন বন্যার সময় টিভিতে দেখতেন স্বেচ্ছাসেবকরা জীবন বাজি রেখে ছুটে যায় বানভাসি মানুষের দোড় গোড়ায় তখন থেকেই তার মনে ইচ্ছা হতো সে কি দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারবেন না?

দেশের জন্য কিছু করতে পারবেন  না? বেশিরভাগ সময় দেখতেন এসবে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বেশি আগায় আসে, অনুপ্রেরণাটা তাদের থেকেই,  ক্লাশ সেভেন এ থাকতে নাম লেখালালেন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি রংপুর ইউনিটে।

বিভিন্ন কর্মশালা তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকলেন দীর্ঘদিন। তখন থেকে তার মধ্যে একটা ইচ্ছা জাগে যে সে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করবে।

কলেজে উঠার পর কলেজের একটা ছোট্ট সংগঠন থেকে ঈদে কিছু পথশিশু বাচ্চাকে আমরা নতুন পোশাক দেন তারা।  কলেজ থেকে বের হওয়ার আগে নিজের কলেজে প্রতিষ্ঠা করেন  সিপিএসসিআর সায়েন্স ক্লাব।

বিভিন্ন সময় স্বেচ্ছাসেবী  সংগঠনগুলোর সাথে বিভিন্ন ধরণের কাজ, কর্মশালা এসব তাকে  আরো বেশি অনুপ্রানিত করে। যখন সবকিছু বুঝে উঠতে শিখলেন তখন তার একটা ইচ্ছা ছিলো যে নিজে এরকম একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করবেন।

২০১৮ ডিসেম্বর মাস, হঠাৎ একদিন রাতে তার এক ছোট বোন মেসেজ দিলেন ভাইয়া সুপার মার্কেটের সামনে প্রতিবন্ধী একজন মহিলা আছে, উনার কেউ নেই, আমরা কি কোনোভাবে উনাকে সহযোগিতা করতে পারি? ওই রাতেই জিসান তার দুই তিনটা বন্ধুর সাথে কথা বললেন, কিভাবে তাকে সহযোগিতা করা যায়? তখন তার মাথায় আসলো যদি সবাই মিলে এক হয়ে একটা প্লাটফর্ম করা যায়,  যেই প্লাটফর্মটা সবসময় এসব অসহায় সুবিধাবঞ্চিত  মানুষের পাশে দাড়াতে পারবে।

এসবের মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু করল জিসানের নিজের হাতে গড়া সংগঠন “চলো স্বপ্ন ছুঁই”। ৩০ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে গত বছর পহেলা বৈশাখে তারা তাদের প্রথম ইভেন্ট করেন, ৬৭ জন ছিন্নমূল শিশুকে শিক্ষা উপকরণ, নতুন পোশাক, দুপুরের খাবার বিতরণ করি।

যাত্রা শুরুতে দুইজন দাতা সদস্যের মাধ্যমে দুইজন অসহায় মানুষের সারাজীবনের দায়িত্ব নেন সংগঠনটি।  এর পর ডিসেম্বরে কয়েকটি হাফেজিয়া মাদ্রাসায় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয় চলো স্বপ্ন ছুঁই এর পক্ষ থেকে।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর প্রকোপে থমকে গেছে পুরো বিশ্ব। দেশেও এই মহামরীর প্রাদুর্ভাব এড়াতে আরোপ করা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। এতে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

তাদের এ দুর্দশা কিছুটা কমিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্মুখ সমরে নিয়োজিত।

তারই ধারাবাহিকতায় রংপুর অঞ্চলজুড়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে অন্যতম প্রধান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “চলো স্বপ্ন ছুই”।

মার্চের ২৩ তারিখ থেকে তার  উদ্যোগে শুরু হয় ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’ এর করোনাকালীন ইভেন্ট। প্রথম দফায় ৫৫টি পরিবারকে ১০ দিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও অর্থসাহায্য প্রদান করেন তারা।

এর পর রংপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা,  নগরীর পাড়া-মহল্লায় জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয়। পাশাপাশি জনসাধারণের মাঝে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণও চলতে থাকেন।

এর মধ্যে রমযান মাস শুরু হলে শ্রমজীবী রোযাদারদের মাঝে ইফতার বিতরণের আয়োজন করা হয়। পুরো রমজান মাসে সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৫০০ প্যাকেট ইফতার সরবরাহ করা হয়। ঈদুল ফিতরের দিন একটি এতিমখানার ৭০ জন শিশুর জন্য দুইবেলা আহারের ব্যবস্থা করেন চলো স্বপ্ন ছুঁই।

আবার, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার যারা লকডাউনের কারণে উপার্জন করতে পারছে না, তাদের ঈদের বাজার করে দেওয়া হয়। এর সাথে নিয়মিত সহায়তা কার্যক্রমও পরিচালনা করেন তারা। করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০০ পরিবারকে ‘চলো স্বপ্ন ছুঁই’ এর পক্ষ থেকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়।

রংপুর শহরে ১৭০০০ মাস্ক বিতরণ করা হয়। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার প্রদান, কর্মক্ষম মানুষের আয়ের পথ সৃষ্টির জন্য হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, সেলাই মেশিন প্রদানের কাজ করছে চলো স্বপ্ন ছুঁই। এখন পর্যন্ত ৫৫ এর বেশি অসহায় পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে পেরেছে চলো স্বপ্ন ছুঁই।

চলো স্বপ্ন ছুঁই’ এর নারী স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নারীদের স্বাস্থ্য রক্ষায় অসহায় পরিবারের ঘরে ঘরে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করা হয়।এব্যাপারে চলো স্বপ্ন ছুঁই এর প্রতিষ্ঠাতা মোঃ মুহতাসিম আবশাদ জিসান এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, “পড়াশুনা করি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। জনগণের দেয়া ট্যাক্সের টাকায় পড়াশুনা করি আমরা।

সামাজিকভাবে আমাদের একটা দ্বায়বদ্ধতা থেকে যায়, সেই দায়বদ্ধতা থেকে হলেও আমাদের সবার এসব সামাজিক ককর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসা উচিত, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের সংগঠনের সব সদস্যই শিক্ষার্থী।

সদস্যদের টিউশন, বৃত্তির টাকায় আমাদের অর্থায়ন হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সমাজের বিত্তবানদের অনেকেই আমাদেরকে সহযোগিতা করে থাকেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের স্বপ্ন পূরণই আমাদের কাজের লক্ষ্য। অসহায় মানুষদের স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজে করে যাচ্ছি আমরা।

আমাদের এই উদ্যোগে উপকার ভোগ করেছেন সমাজের অসংখ্য মানুষ। আমাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ আমরা খুব অল্প সময়ে অর্জন করেছি DYC International Bravery Award,  Covid-19  Hero Award এবং Corona Warrior Moyurpongkhi Global Award।

আগ্রহী শিক্ষার্থীরা সমাজসেবায় নিজেকে যুক্ত করার সুযোগ পেয়েছে। আমরা আমাদের  এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা আনতে চাচ্ছি সেই সাথে অসহায় মানুষের মলিন স্বপ্নগুলোকে আলোকিত করার যে প্রত্যয় নিয়ে চলো স্বপ্ন ছুঁই যাত্রা শুরু করেছিলো সকলের সহযোগিতায় ইনশাআল্লাহ সেই স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে।”

About newsroom

Check Also

নারী সব পারে: এডিসি লাকী

 ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মাহমুদা আফরোজ লাকী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে আইন …