সোমবার , ২৫ জানুয়ারি ২০২১

নওগাঁয় ২ জন গৃহবধূকে গলাকেটে হত্যা

শহিদুল ইসলাম জি এম মিঠনঃ
নওগাঁয় ২ জন গৃহবধূ সাথী বেগম (৩২) ও পরী বেগমকে (২৬) কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের ঘটনায় দীর্ঘ ৬ মাস পার হলেও ঘটনার কারণ উৎঘাটন করতে পারেনি স্থানীয় থানা পুলিশ।
অপরদিকে নিহত পরী বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হত্যাকান্ডে জড়ীত থাকার অভিযোগ তুলেছেন পরী বেগমের আত্মীয়-স্বজনরা, একই সাথে পুলিশের বিরুদ্ধে নিহতদের পরিবাররা ঘুষ গ্রহণ, অসদাচরণসহ নানান অভিযোগ তুলেছেন এবং পাশাপাশি দ্রুত এই আলোচিত দুটি হত্যার রহস্য উদঘাটন সহ আসামীদের গ্রেফতারের জন্য জেলা পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের আশুদৃষ্টি কামনাও করেছেন।
নিহত সাথী বেগম নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পারআধাইপুর গ্রামের কাঠ মিস্ত্রী আব্দুল কাদিরের স্ত্রী ও পরী বেগম একই উপজেলার কোলা (বিজিপাড়া) গ্রামের স-মিল ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
জানা গেছে, নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা বাজারে পাশাপাশি টিনের বাসায় ভাড়া থাকতেন একই উপজেলার পৃথক গ্রামের ঐ ২ জন গৃহবধূ সাথী বেগম ও পরী বেগম।
বাসার মালিক নজরুল ইসলাম নজু ও তার স্ত্রী নার্গিস খাতুন জানান, সেখানে স্থানীয় এক কবিরাজের সাথে পরিচয় হয় সাথী বেগমের। এরপর থেকে সাথী বেগমের সাথে পরী বেগম মাঝে মধ্যেই রাতে বাসার বাহিরে থাকতেন। তাদের জিজ্ঞাসা করলেও তারা বলতেন না রাতে কোথায় ছিলেন।
গত ৩ জুন সন্ধ্যায় এমন ভাবেই কাউকে না বলেই সাথী বেগম ও পরী বানু বাইরে গিয়ে হত্যার শিকার হন । পরের দিন ৪ জুন উপজেলার চাংলা গ্রামের একটি গভীর নলকূপের ঘড়ে দুই নারীর মৃতদেহ দেখাতে পেয়ে থানায় সংবাদ দেন। এরপর থানা পুলিশ ঘটনা স্থলে পৌছে নিহতদের মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
দু গৃহবধূকে হত্যার পর চাংলা গ্রামের কবিরাজ আবু হাসান মুকুল, পরী বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম সহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসেন পুলিশ। সে সময় কবিরাজ মুকুলকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও এখন পর্যন্ত হত্যার ঘটনা উৎঘাটন বা জড়ীতদের কাউকে আটক করতে পারেনি থানা পুলিশ।
নিহত পরী বেগমের ভাবী একই উপজেলার কয়াভবানীপুর গ্রামের রুপালী বেগম জানান, জানামতে পরি বেগমের কোন শত্রু ছিল না। তবে পরী বেগমের বিয়ের পর থেকেই স্বামী নজরুল ইসলাম ও তার পরিবারের লোকজন পরী বেগমকে মারপিট ও নির্যাতন করতেন। ফলে গ্রামের বাড়ি বিজিপাড়ায় থাকতে না পেরে কোলা বাজারে ওই বাসা ভাড়া থাকতে হয়েছে পরিকে। স্বামী ও তার ছেলে সহ পরিবারের লোকজন পরীকে পরিকল্পিত অন্য কোথাও হত্যা করে ওই গভীর নলকূপে ফেলে গেছেন বলেও মন্তব্য প্রকাশ করেন।

পরীর চাচী জরিনা সাংবাদিকদের জানান, পরীকে হত্যার পর থানায় মামলা করতে গেলে স্বামী নজরুল ইসলামের লোকজন বলেছেন, থানায় ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পুলিশ কিনে রাখা হয়েছে। পুলিশ তাদের কোন মামলাই নিবে না।
পরীর চাচা জায়িম উদ্দিন জানান, হত্যার ঘটনায় থানায় স্বামী নজরুল ইসলাম গংদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে আমাদের পরিবারের লোকজনদের সাথে অসদাচরণ করেন।
তার মা আকতারুন বেগম জানান, পরীর পাশের ভাড়াটিয়া সাথীর স্বামী কাদেরের যোগসাজশে পরীর স্বামী নজরুল ইসলাম তার পরিবারের লোকজনকে রাতে নিয়ে যায়। এরপর পরীকে হত্যা করে। হয়তো পরীকে হত্যার ঘটনাটি প্রকাশ পেতে পারে সেই জন্যেই সাথীকেও হত্যা করা হয়েছে।
নিহত পরী বেগমের বাবা নজরুল ইসলাম জানান, তার মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংস ভাবে গলা কেটে হত্যার পর থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। এ সময় থানা থেকে জানানো হয় পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছে। এর ৫ দিন পর আবারো মামলা দায়ের করতে গেলে সঠিক বিচার পাবো বলে পুলিশ একই কথা বলে থানা থেকে এক প্রকার তাড়িয়ে দেন। আমার মেয়ে মৃত্যুর ৬ মাস পেড়িয়ে গেলেও এ পর্যন্ত পুলিশের কোন কর্মকর্তা আমার বাড়িতে আসেননি বা কোন তথ্যও পাচ্ছি না জানিয়ে তিনি আরো জানান, তিনি কিভাবে এজাহারে বাদি হয়েছেন তা নিজেও জানেন না।
তিনি একাধিকবার থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। দ্রুত এই হত্যার কারণ উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
অপরদিকে পরী বেগমের স্বজনদের উপরোক্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তার স্বামী নজরুল ইসলাম বলেন, তিনিও তার স্ত্রী হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করছেন বলে তাকে থানা থেকে চলে যেতে বলে পুলিশ। তিনি চলে এসেছেন।
নিহত সাথীর শ্বশুর আমজাদ হোসেন ও তার পরিবারের লোকজন পুলিশের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে বলেন, এই হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে আমাদের পরিবারের লোকজনদের সাথে পুলিশ দুর্ব্যবহার করেন সে সময়।
নিহত সাথী বেগমের স্বামী আবুল কাদের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, পরী বেগমের স্বজনরা যে অভিযোগ করেছেন তা সত্য নয়। তিনিও তার স্ত্রীসহ ওই মহিলা হত্যাকান্ডে জড়ীতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
নিহতদের স্বজনরা সহ স্থানিয়রা মনে করছেন, এই আলোচিত জোড়া হত্যার আসামীদের আড়াল করতে কোন প্রভাবশালী চক্রের হাত রয়েছে। যার ফলে দীর্ঘ ৬ মাসেও হত্যার কারণ উৎঘাটন বা জড়ীতদের আটক করতে পারেনি পুলিশ।
বদলগাছী উপজেলার স্থানীয় কোলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শাহিনূর ইসলাম স্বপন সাংবাদিকদের জানান, আলোচিত জোড়া হত্যাকাণ্ডের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এ হত্যার কোন রহস্য উৎঘাটন করতে পারেনি। দ্রুত রহস্য উৎঘাটন সহ জড়ীত আসামীদের গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার রাকিবুল আকতার জানান, এই জোড়া হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে কবিরাজ আবু হাসান মুকুল সহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে চাংলা গ্রামের আবু হাসান কবিরাজ মুকুলকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পরও হত্যার কোন কারণ উদর্ঘাটন বা ক্লু-না পেলেও এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ তৎপর রয়েছে, এজোড়া হত্যাকান্ডে জড়ীতরা কেউ ছাড় পাবেনা, জড়ীতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।

About newsroom

Check Also

নওগাঁয় জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

শহিদুল ইসলাম জি এম মিঠন, স্টাফ রিপোর্টার: নওগাঁর মহাদেবপুরে পরিয়ায়ী পাখি ও জীব বৈচিত্র সংরক্ষণে …