পেঁয়াজের পর এবার চাল আলু সবজি

0
20

সরকারের নানা পদক্ষেপেও নিত্যপণ্যের বাজারের উত্তাপ কমছে না। পেঁয়াজের সেঞ্চুরি (প্রতি কেজি সর্বোচ্চ একশ’ টাকা) অব্যাহত থাকার পাশাপাশি চাল, আলু ও বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সরকার নির্ধারিত চালের দাম বাস্তবায়নে তোয়াক্কা করছেন না মিলাররা। এছাড়া বেড়েছে ডাল, ভোজ্যতেল, আদা-রসুন ও ডিমের দাম। এমন পরিস্থিতিতে রীতিমতো দিশেহারা ভোক্তরা। বিশেষ করে নাভিশ্বাস উঠেছে নিু ও সীমিত আয়ের মানুষের।

খুচরা বাজারে কোনো ধরনের সবজি কেজিতে ৮০-৯০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে মিল পর্যায়ে চালের দাম নির্ধারণ করা হলেও বস্তায় (৫০ কেজি) ২০০-২৫০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। যার প্রভাবে খুচরা বাজারে মোটা চালের কেজি সর্বোচ্চ ৫২ টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।

এছাড়া ভারতের বিকল্প দেশ থেকে সরবরাহ বাড়ানো হলেও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর গত বছরে এ সময় আলু প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকা বিক্রি হয়েছে, কিন্তু এ বছর তা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকা। এদিকে অস্বাভাবিক এ দাম বৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গা-ছাড়া বাজার তদারকিতে বারবার সেই পুরনো সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেয়া হয়নি। ফলে নানা ইস্যুতে বছরে কয়েকবার নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলে। আর সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অল্প সময়ে হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা।

শনিবার রাজধানীর নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজার ও জিনজিরা বাজারের খুচরা চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৮ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৫৩-৫৪ টাকা। বিআর ২৮ চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৪৬-৪৭ টাকা। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৫০-৫২ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৪০-৪২ টাকা।

মালিবাগ কাঁচাবাজারের খালেক রাইস এজেন্সির মালিক ও খুচরা চাল বিক্রেতা মো. দিদার হোসেন বলেন, সবাই যখন পেঁয়াজের ঝাঁজে অতিষ্ঠ, ঠিক তখন মিলারদের সিন্ডিকেট নীরবে চালের দাম বাড়িয়েছে। যা এখনও অব্যাহত আছে। যে কারণে পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

একই দিন রাজধানীর সর্ব বৃহৎ পাইকারি আড়ত বাদামতলী ও কারওয়ান বাজারে পাইকারি চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ৫৪ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৫১-৫২ টাকা। বিআর ২৮ চাল বিক্রি হয়েছে ২৩৫০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২২০০ টাকা। আর স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হয়েছে ২৩০০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২০৫০ টাকা। কারওয়ান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান  বলেন, নীরবে মিলাররা প্রতি বস্তা চালে ২০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। যার প্রভাবে পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে। তিনি জানান, কোনো অজুহাত পেলেই তারা দাম বাড়ান। এবার সরকার বোরো ধান সংগ্রহ ঠিকমতো করতে পারেনি। মিলাররা যে যেভাবে পেরেছে ধান কিনেছে। তাই বাজার এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। যে কারণে মিলাররা সিন্ডিকেটে করে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়েছে। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও মিলাররা তা অমান্য করছেন। তারা তাদের ক্ষমতা দেখিয়ে সরকারের বেঁধে দেয়া দামে চাল বিক্রি করছেন না। যার কারণে বাজারে চালের দাম কমছে না।

অন্যদিকে নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চলের মিল পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ দিন প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছে ২৭০০-২৭৫০ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২৫০০ টাকা। সেক্ষেত্রে ১৫ দিনে বস্তা প্রতি বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা। বিআর-২৮ জাতের চাল বিক্রি হয়েছে ২৩৫০-২৪০০ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২১৫০ টাকা। এছাড়া মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হয়েছে ২৩০০ টাকা। যা ১৫ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২০০০ টাকা। তবে খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিল মালিকদের বৈঠকের পর প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল ২৫৭৫ টাকায় বিক্রি করতে নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আর বিআর ২৮ চাল বস্তায় ২২৫০ টাকায় বিক্রি করতে বলা হয়। কিন্তু সরকারের আদেশ অমান্য করে মিলাররা বাড়তি দরে চাল বিক্রি করছেন।

নওগাঁয় এক মিল মালিক   বলেন, চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। কারণ কৃষকরা এখন ধান ধরে রেখেছে। তাই মিল পর্যায়ে ধানের সরবরাহ কমেছে। যে কারণে একটু বেশি দর দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তাই দাম কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে দুর্নীতিবিরোধী আর্ন্তজাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান  বলেন, বর্তমান বাজার ব্যবস্থা ক্রেতাদের জন্য নয়, বিক্রেতাদের জন্য। অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে এমন হচ্ছে। যারা অসাধু ব্যবসায়ী, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সৎ সাহস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই।

আবার কর্তৃপক্ষ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সুবিধাভোগী। যে কারণে এটি একটি দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়েছে। আর সাধারণ মানুষ এ দুষ্ট চক্রের হাতে জিম্মি। তিনি বলেন, মূল বিষয় হল, সুশাসনের ঘাটতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। এখানে কারও নিয়ন্ত্রণ নেই। সুশাসন নিশ্চিত না হলে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এছাড়া গা-ছাড়া তদারকিতে ভোক্তারা কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

শনিবার রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮৬ টাকা। যা ৫ দিন আগে ছিল ৬৫ টাকা। এছাড়া মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা। যা ৫ দিন আগে ছিল ৬০ টাকা। পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা। যা ৫ দিন আগে ছিল ৫০ টাকা। এছাড়া রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা। যা ৫ দিন আগে ছিল ৮৫-৯০ টাকা। এবং আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা। যা ৫ দিন আগে ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হয়।

হঠাৎ দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে শ্যামবাজারের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ী  বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর থেকে দেশের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা বিকল্প বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছেন। এসব পেঁয়াজ দেশের বাজারে ঢুকতেও শুরু করেছে। দাম কিছুটা কমছিল। তবে টিসিবি স্থানীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ ক্রয় করায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহের সংকট দেখা দিচ্ছে। যে কারণে দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, এ দিন বোতলজাত সয়াবিনের মধ্যে ৫ লিটার সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৪৭০-৫২০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৪৬০-৫১৫ টাকা। পাম অয়েল (লুজ) প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ৮২-৮৩ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা। প্রতি কেজি দেশি আদা মানভেদে বিক্রি হয়েছে ১১০-১৬০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৯০-১৪০ টাকা। আমদানি করা আদা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২৪০-২৮০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ২০০-২৫০ টাকা। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা।

অন্যদিকে মাত্র ১ সপ্তাহের ব্যবধানে বেগুনের দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা, বরবটি ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা, গাজর কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৯০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি শিম বিক্রি হয়েছে ১৩০-১৬০ টাকা। এছাড়া সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা দাম বেড়ে দেশি শসা বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা, করলা কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা, প্রতি কেজি কাঁকরোল আকার ভেদে ৮০-৯০ টাকা বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি ঢেঁড়স বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি আলু বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা। প্রতি কেজি টমেটো সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ১৩০-১৪০ টাকা। এছাড়া কাঁচা মরিচ কেজিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদফতরের সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুদদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, বেপারি, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজিও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ।

বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, বাজারে পণ্যমূল্য কমাতে প্রতিদিন একাধিক টিম তদারকি করছে। ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়মতান্ত্রিক ও নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনাকে এ অধিদফতর সবসময়ই স্বাগত জানায়। কিন্তু অসাধু ও অনৈতিক যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে অধিদফতর জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না।